কেন আমি ‘নাস্তিকতা অধ্যয়ন কেন্দ্র’ নামে নতুন একটা উদ্যোগের বিষয়ে আগ্রহী

[ফেইসবুকের মেসেইজ অপশনে লোকজন আমাকে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করে। এমনই এক প্রশ্নের একটু আগে যে উত্তর দিলাম, ভাবলাম এই ধরনের বিষয়গুলো আমাদের অনেকেরই জানা দরকার। প্রশ্নকর্তার ব্যক্তিগত পরিচয় প্রাইভেসির ব্যাপার। কথাটা কী ছিল এবং আমি কী বলেছি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।]

*****

হ্যালো স্যার, কেমন আছেন? আপনি মে বি আমাকে চিনবেন না। আমি আপনার কিছু লেখা পড়েছি। ভালো লেগেছিল।

আচ্ছা, ইসলামের কোন কোন ব্যাপারগুলোর কারণে আপনি এই ধর্মকে বেছে নিয়েছেন? জানার খুব ইচ্ছা ছিল।

আমার বিশ্বাসের ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে গেলে বলব, আমার প্রচলিত কোনো ধর্মেই বিশ্বাস নেই। আর ঈশ্বরে বিশ্বাস নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। এইখানে আপনি চাইলে আমাকে অজ্ঞেয়বাদী ধরে নিতে পারেন। আমি মনে করি, প্রচলিত অর্থে ঈশ্বর বলতে মানুষ যা বুঝে সেই ধরনের ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ কিংবা বাতিল করা কোনোটাই সম্ভব নয়।

আর ধর্ম কেন বিশ্বাস করি না সেটার কারণ হিসেবে বলবো, আমি কে, কোথা থেকে আসলাম, কেন আমি এখানে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমি আসলে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে চাই। ধর্মে বিশ্বাস করার মানে হলো, আদম-হাওয়ার ঘটনা আমাকে বিশ্বাস করতেই হবে। না বিশ্বাস করলে ঈমান থাকবে না, শাস্তি হবে। এইসব কথা আমার মধ্যে ভয় জাগানোর পরিবর্তে আসলে ধর্মের প্রতি আরো বিতৃষ্ণ করে দেয়।

আমি বিবর্তনে বিশ্বাস করি। বাট বিবর্তনে এসে আমার প্রশ্ন শেষ হয়ে গেছে এমন না। বিবর্তন জিনিসটাও তো কোনো উন্নত সিভিলাইজেশন বা সাধারণ মানুষ গড বলতে যা বুঝায় সেরকম কারো প্রোগ্রামড হতে পারে। অথবা এরকম কিছুও হতে পারে যেটা মানুষ এখনো কল্পনা করতে পারে না বা কোনদিন পারবেও না। আমি বিজ্ঞান ভালোবাসি ও বিজ্ঞানবাদী। কারণ, বিজ্ঞান এইগুলোর সবই মাথায় রাখে ও উত্তর খোঁজে।

বিজ্ঞানের লিমিটেশন দেখায়ে অন্ধভাবে আদম-হাওয়া কিংবা ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে বর্ণনাকৃত অন্যান্য স্টোরিগুলো মেনে নেওয়া কোনো সমাধান নয় আমার কাছে। তাছাড়া আমার কাছে এগুলা বোরিং লাগে। প্রশ্ন করার মাঝেই আনন্দ পাই। ধর্ম তো আমারে এই ধরনের প্রশ্ন করারই অনুমতি দেয় না।

*****

উপরের এই কথাগুলোর উত্তরে আমি যা বলেছি তা হুবহু উদ্ধৃত করছি:

ইসলাম, যেটাকে আপনি ধর্ম হিসেবে বলছেন, সেটাকে আমি আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম। ‘বেছে নিয়েছিলাম’ – কথাটা এভাবে বলছি এ জন্য যে, আমি মেট্রিক-ইন্টার পরীক্ষার পরেও, এমনকি জুমার নামাজও পড়তাম না। দেখতাম, পরীক্ষার পরে, বিশেষ করে রেজাল্টের আগে বন্ধুরা ঘন ঘন নামাজ পড়তো। আমি এমনকি রোজাও রাখতাম না। এবং কখনও আমি ধর্মের কোনো কিছু শিখি নাই। যদিও আমাদের পরিবার ছিল ধর্মভীরু পরিবার। আমার বাবা-মা-ভাই-বোন আমাকে এগুলো শেখানোর এবং প্র্যাকটিস করানোর অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমি আমার মতো করে চলতাম।

ছোটবেলা থেকে আমি ছিলাম জীবনঘনিষ্ঠ। বলতে পারো, জীবনবাদী। নিজেকে, জীবনকে, জগতকে বোঝার চেষ্টা সবসময় করেছি। ইন্টার পর্যন্ত সায়েন্সের স্টুডেন্ট ছিলাম। তখনকার স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে ভালো স্টুডেন্টই ছিলাম। নিতান্তই জানার আগ্রহ থেকে ফিলোসফিতে ভর্তি হয়েছিলাম।

এ কথাগুলো এজন্য বললাম, আমার অতীতের সাথে আপনার বর্তমানের একটা মিল খুঁজে পাচ্ছি, তাই। আসলে আমাদের প্রত্যেককে নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়। সেটাই সঠিক পন্থা।

আর হ্যাঁ, ধর্ম বলতে আপনি যাকে দেখেছেন, বুঝেছেন; অন্যদিকে আমাদের সমাজের আলেম-ওলামা তথা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ যে ধরনের ধর্ম এবং ইসলামকে যেভাবে একটা ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন, কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন ও জীবনবাদী কারো পক্ষে সেটাকে সমর্থন করা অসম্ভব-প্রায়। এর মাঝে আবার ভেজাল তৈরি করেছেন রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা। ইসলামকে যেভাবে একটা রাজনৈতিক ধর্ম হিসেবে তারা উপস্থাপন করেন সেটা অনেকখানি স্ববিরোধী।

আমার কাছে ইসলাম একটি দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা। যেটাকে আমি জেনেছি সরাসরি পড়াশোনা করে। আমি সরাসরি কুরআনের অনুবাদ পড়েছি। সরাসরি হাদীসের গ্রন্থগুলো গল্প-উপন্যাস পড়ার মতো করে থরোলি পড়েছি। এবং সীরাতের গ্রন্থসমূহও ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়ন করে বোঝার চেষ্টা করেছি। আলেম-ওলামা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সাথে সময় ও সুযোগ পেলেই নানা বিষয়ে জানতে চেয়েছি, মতবিনিময় করেছি। আই ওয়াজ অন অ্যা জার্নি।

আমি মনে করি, আমার ফেসবুক কভার ফটোতে যে কথাটা আছে সেটি অনেক বড় একটা সত্য কথা। কথাটা হলো “কথা বলতে দিতে হবে। চাই, প্রশ্ন করার অধিকার।” প্রশ্নটি যদি ভুলও হয়ে থাকে, তারপরও সেই কথাটি বলতে দিতে হবে। সে কথাটি শুনতে হবে। তবে কথা হলো, সব প্রশ্ন সঠিক প্রশ্ন নয়। কিছু প্রশ্ন ভুল প্রশ্ন বা ক্যাটাগরি মিসটেক। কিছু প্রশ্ন সঠিক প্রশ্ন, যার সঠিক উত্তর ধারণ করার ক্ষমতা প্রশ্নকর্তার নাই। যেটাকে আমরা জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিতে limit of cognitive capacity বা potentiality হিসাবে বলে থাকি। ভুল প্রশ্ন বা জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রে প্রশ্নকর্তাকে সুন্দর যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে, কেন তার উত্থাপিত প্রশ্নটি ভুল; অথবা তার জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা কোথায় এবং কী কারণে।

এবার আসল কথায় আসা যাক। কুরআন কীভাবে মানুষকে অ্যাপ্রোচ করে সেটা যদি আপনি সরাসরি কুরআন থেকে বোঝার চেষ্টা করেন তাহলে দেখবেন, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তার বিবেক, বুদ্ধি, জীবন ও অভিজ্ঞতা থেকে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে জানার এবং সত্যকে খুঁজে নেওয়ার জন্য বারবার বলেছেন। তাগিদ দিয়েছেন। বিশেষ করে মক্কী সূরাগুলোর এটি ডমিন্যান্ট ট্রেন্ড। সমস্যা হলো, আমরা ইসলাম শুরু করি ‘ফতেহ মক্কা’ থেকে। অথচ, এটি সুস্পষ্টভাবে এক অপরিহার্য ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে।

কথাটা পরিষ্কার, আদম-হাওয়া বা এক্স-ওয়াই-জেড ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি, আপনি, আপনার, আমার – আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অস্তিত্ব। আমাদের কগনিটিভ জার্নি শুরু হয় নিজেদের অস্তিত্ব বা আত্মসত্তার উপস্থিতির অনুভবের মাধ্যমে। শেষ হয় এক পরম সত্তার উপস্থিতির উপলব্ধি এবং তাঁর প্রতি সমর্পিত হওয়ার মাধ্যমে। আস্তিক নাস্তিক প্রত্যেকেরই একই অবস্থা। প্রত্যেকের মধ্যে আছে কাইন্ড অব সোল সার্চিংয়ের ইনহারেন্ট টেন্ডেন্সি। প্রত্যেকের মধ্যে ভিতরে ভিতরে কাজ করে এক ধরনের sense of transcendence। which is a kind of spirituality। কারো কাছে পরমসত্তা হলো পার্সোনাল গড। কারো কাছে পরমসত্তা হলো নিছকই ফিলোসফিক্যাল গড।

একজন নিরীশ্বরবাদী ‘প্রকৃতি’ নামক অনস্তিত্বশীল (?) অথচ সদা সক্রিয় একটা এনটিটি বা সত্তাকে যখন বারে বার রেফার করে কথা বলেন, তিনি যদি সেটা সম্পর্কে খোলা মনে জানার চেষ্টা করেন তাহলে দেখবেন, তার নিরীশ্বরবাদী জ্ঞানজগতে ‘প্রকৃতি’ নামক এই যে mysterious phenomena বা রহস্যময় প্রপঞ্চ, সেটার ভূমিকা, বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রম ঈশ্বরবিশ্বাসীদের ঈশ্বর-প্রপঞ্চের হুবহু সমার্থক। কার্যত দুটো অভিন্ন ফেনোমেনা। পার্থক্য হলো, ধর্মের ঈশ্বরকে এবাদত করা হয়। কিন্তু ‘প্রকৃতি’ নামক বিজ্ঞানবাদীদের এই ঈশ্বরকে সেভাবে অর্চনা করা হয় না।

মানুষ অন্তর্গতভাবেই বিশ্বাসী চরিত্রের। জ্ঞান মাত্রই বিশ্বাস। তবে বিশ্বাস মাত্রই জ্ঞান নয়। শুধুমাত্র সেই বিশ্বাসগুলো জ্ঞান হিসেবে বিবেচনার যোগ্য যেগুলো সত্যত-সমর্থিত ও যাচাইযোগ্য। আমাদের জ্ঞানতত্ত্বে যেটাকে বলে justified true belief। আপনাকে হেল্প করার মতো আমার অনেক লেখা, ভিডিও-বক্তব্য, অনেক কিছু আছে। এগুলোর লিঙ্ক দিয়ে আপনাকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না। ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করতে পারলে কথাগুলো আরো অনেক গুছিয়ে সুন্দর করে বলা যেত। যা হোক।

আমার অফিস রুম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবন ১০২ নম্বর কক্ষের দরজায় একটা কথা লিখেছিলাম বহু বছর আগে। কথাটা এখনো সেভাবেই সেখানে আছে। কথাটা কি জানেন? সেটি হলো, “আসুন আপন আলোয় পথ চলি”।

আমি যেসব বিষয়ে পড়াই তার সবই হচ্ছে সমকালীন পাশ্চাত্য জ্ঞানতত্ত্ব এবং তার সাথে সম্পর্কিত নানা বিষয়। জ্ঞানতত্ত্বের ভাষায় বলতে গেলে কথাটা এভাবে বলতে হয়, even if you are right but you didn’t explore it, then it will not be knowledge for you. knowledge must be truth based and justified or justifiable. ব্যাপারটাকে আমি সাধারণত এভাবে বলে থাকি, knowledge must be achieved or acquired. It can’t be given. ‘Flexiloaded’ knowledge is not knowledge. at best, it could be a lucky guess.

সেজন্যই জানতে চাওয়া, প্রশ্ন করা এবং নিজের মতো করে চলা, এটি হচ্ছে প্রপার মেথডলজি, যে কোনো আদর্শের, আমার দৃষ্টিতে ইসলামেরও। আমাদের প্রচলিত সামাজিক ইসলামে যেটার কোনো সুযোগই নাই। আমাদের সমাজে প্রচলিত এই ডমিনেন্ট সামাজিক ইসলাম হলো repressive, dogmatic and mostly ritualistic। আমি যদি সরাসরি এবং খোলা মনে ইসলামের মৌলিক উৎসগুলো থেকে পড়াশোনা না করতাম তাহলে আমার অবস্থাও আপনার মতোই হতো। হয়তোবা। ভালো থাকেন। যোগাযোগ রাখবেন।

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Mohammad Tasfikur Rahman: স্যার, আপনার মতো আমারও প্রশ্ন করে ওটার উত্তর পেতে আনন্দ লাগে। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে মাথার মধ্যে কোনো প্রশ্ন ঘুরলে ওটা জোর জবরদস্তিপূর্বক চাপা দেওয়ার ট্রাই করি। কারণ, আল্লাহ নারাজ হবে আমার উপর এই ভয়ে।

স্যার, আমার মাথায় প্রশ্ন আসলে ওটা উত্তর না জেনে চেপে রাখলে শান্তি পাই না। এমনকি একাডেমিক পড়ার সময়ও ওটা ঘুরতে থাকে, মনোযোগ দিতে পারি না পড়ায়।

এক্ষেত্রে আমার কর্তব্য কী? আমার ভাবনা, আল্লাহ নারাজ হবেন। এটা কী সঠিক? ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমরা কুরআন শরীফ থেকে জানতে পারি, নবী হওয়ার পরেও ইব্রাহিম (আ) আল্লাহর সাথে তাঁর সৃষ্টি-ক্ষমতা নিয়ে সওয়াল-জওয়াব করেছেন এবং আল্লাহ তায়ালা পাখির ঘটনা দিয়ে ইব্রাহিমকে (আ) বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমরা এটাও দেখতে পাই উযাইর (আ) নবী হওয়ার পরও আল্লাহ তায়ালার সাথে তাঁর ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। যেটা কোরআন শরীফে আছে। সে ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা উযাইরকে (আ) মৃত্যু ঘটানো এবং দীর্ঘদিন পরে জীবনদানের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন। মোহাম্মদ (সা) আল্লাহ তায়ালাকে এ ধরনের কোনো প্রশ্ন করেছেন বলে আমরা জানি না। কিন্তু আমরা এটুকু জানি, আল্লাহ তায়ালা তাকে মেরাজের মাধ্যমে ঊর্ধ্বজগতে নিয়ে গিয়ে সব কিছু চাক্ষুষ দেখিয়ে এনেছেন। বলা বাহুল্য, এটা মহানবীর (সা) জন্য সহায়ক হয়েছিল এবং এতে করে উনার ঈমান ও আত্মবিশ্বাস নিশ্চিতভাবে আরো অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছিল। আমরা জানতে পারি, ইমাম গাজ্জালীর মতো ব্যক্তি বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসায় প্রধান শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও এক পর্যায়ে নাস্তিক হয়ে গিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ আট বছর পর্যন্ত তিনি এখানে ওখানে ঘুরে বেড়িয়েছেন, জীবন ও জগতকে জানা ও বোঝার চেষ্টা করেছেন। এরপরে যখন তার মধ্যে sanguinity বা স্থির বিশ্বাস ফিরে এসেছে তখন তিনি আবার উক্ত মাদ্রাসায় শিক্ষকতা নিয়োজিত হন। এই নিয়ে তিনি একটা বই লিখেছেন, যেটার বাংলা অনুবাদ পাওয়া যায়। বইটার নাম ‘সত্যের সন্ধানে’। আরবী নাম হচ্ছে ‘আল-মুনকিদ মিনাদ দালাল’।

নামাল আল বাহরাইনি: সামাজিক ইসলাম, “repressive, dogmatic” একটু ডিটেইলিং করলে বুঝতে সুবিধা হতো। “and mostly ritualistic”- তো রিচুয়্যাল এবং প্রাকটিসের কথা কি কুরআন-হাদীসে বলা হয়নি? আশা করি ব্যাখ্যা করে বাধিত করবেন। ধন্যবাদ ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমাদের বুঝার সুবিধার জন্য আমরা দ্বীন এবং শরীয়তকে আলাদা করেছি। দ্বীন হিসেবে ইসলাম সব নবীর জন্য একই ছিল। কিন্তু প্রত্যেক নবীর শরীয়ত আলাদা ছিল। এই কথাটা যদি ঠিক হয় তাহলে আমরা বুঝতে পারি, দ্বীন হচ্ছে শরীয়তের উপরের ব্যাপার। শরীয়ত হলো দ্বীনের বহিঃপ্রকাশ বা দাবি। যেমন করে আমল হলো ঈমানের দাবি। সূরা বাকারার ১৭৭ নাম্বার আয়াতে দেখবেন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ইসলামের মূল স্পিরিট তথা দ্বীনি চেতনা না থাকলে নানা ধরনের ইবাদত বা রিচ্যুয়ালগুলো অর্থহীন।

Muntasir Mahmud: চমৎকার উত্তর দিয়েছেন। এমনকি আমিসহ অনেকের জন্যেই প্রযোজ্য।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: প্রশ্নকর্তার মূল প্রশ্নের মধ্যে বিবর্তনবাদ, বিজ্ঞানবাদ এসব বিষয় নিয়ে কথা ছিল, যেগুলো আমার উত্তরের মধ্যে আসে নাই। উত্তরটা দেয়ার পরে ভাবলাম পুরো প্রশ্নোত্তরটাই পোস্ট হিসেবে দিয়ে দেই। ফেইসবুক ওয়ালে পোস্ট হিসেবে দেবো, এটা যদি প্রথম থেকে ভাবতাম তাহলে এই দুইটা পয়েন্টেও কিছু কথাবার্তা বলতাম।

সে যাই হোক। কথাগুলো কি তোমার ভালো লাগছে? আগ্রহী শ্রোতা পেলেন আমি এ ধরনের কথা প্রচুর পরিমাণে বলতে চাই। হাটে-ঘাটে-মাঠে, ঘরে-বাইরে, ছোট-বড়, ছেলে-মেয়ে – সবার সাথে সব সময়ে। সুইসাইড প্রতিরোধে ইমার্জেন্সি কাউন্সিলিং ব্যবস্থার মতো দিনরাত ২৪ ঘন্টা ‘faith crisis support centre’ টাইপের কোনো একটা ব্যবস্থা চালু করতে পারলে খুব ভালো হইত।

এগুলো কথার কথা। আমার অনেক ভাবনা চিন্তার মতোই, এলোমেলো বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন কিন্তু আবেগমথিত…

Muntasir Mahmud: আপনার চিন্তা করার ধরনটাই ভালো লাগে। অবশ্যই প্রশ্ন করার অধিকার থাকতে হবে, তাহলেই মানুষ সত্যটা বের করতে পারবে। আর নিজেকেই বের করতে হবে সব, নিজের চেষ্টায়, নিজের ইচ্ছায়। এই মানুষটি যে প্রশ্ন করলেন, তার উত্তর যে এভাবে দেয়া যায়, এটাই আগে অনেকে ভাবতে পারতো না, এখনো পারে না। কারণ তারা ভাবে, এই প্রশ্ন করার অধিকারই কারো নাই। একজন কমেন্ট করেছে দেখলাম, আল্লাহ নারাজ হবে যদি প্রশ্ন করি! অথচ এই নারাজ হবার ভয়ের কারণে সে আল্লাহকে চিনার চেষ্টাই করলো না। সে নিজে আল্লাহরে চিনলো না, তারে অন্য কেউ যেভাবে চিনাইছে সেটাই সে মেনে নিছে, প্রশ্ন করতেও ভয় পাচ্ছে!

শুধু ভালো না, এই কথাগুলা আমার কাছে অন্যরকম ভালো লাগা। এর পরিমাণ বুঝানো যাবে না। আমিও আবেগী এবং বিশ্বাস করি, আবেগ ছাড়া সীমা ছাড়ানো যায় না। আপনার সাথে থাকা, বসা, কথা শোনা বা পোস্ট পড়া মানেই সৌভাগ্য। এতে জ্ঞান বাড়ে। সৃষ্টি হয় ভালো কিছু।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তোমরা তো ইসলাম সম্পর্কে আমার থেকে অনেক বেশি জানো। Formally and institutionally, you guys are authority. but I am just a commoner-follower। তবে আমি যতটুকু দেখেছি তাতে ইসলাম আমার যত ভালো লেগেছে, সেটাকে যত আপন করে নিয়েছি, ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা ততটা সুখকর নয়।

এটি শুধুমাত্র এ সময়কার বা নির্দিষ্ট কোনো ঘরানার ইসলামিস্টদের জন্য প্রযোজ্য, এমন নয়। বরং আমার দৃষ্টিতে এসব অচলায়তন দীর্ঘদিন থেকেই চলছে। বলতে পারো হাজার বছর ধরে। খেলাফত তথা অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সমস্যাগুলো তখন ততটা বুঝা যায় নাই, যতটা এখনকার পরাজিত অবস্থা ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমরা রিয়েলাইজ করছি।

আমার মতে, জগদ্দল পাথরের মতো বদ্ধমূল হয়ে থাকা ভুল ধ্যান-ধারণাগুলোকে একেবারে গোড়া থেকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। বিশেষ করে মানুষের চিন্তার নিজস্বতা ও মৌলিকত্ব এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে যেসব বিভ্রান্তি আছে সেগুলোকে নির্মমভাবে হটিয়ে দিতে হবে। হক কথাগুলো বলতে হবে প্রাণ খুলে।

সামগ্রিক বিবেচনার প্রেক্ষিতে আমি জীবনের অবশিষ্ট সময়ে কনসেপ্ট ক্লারিফিকেশনের বিষয়ে আমার অ্যাক্টিভিজমকে ফোকাসড রাখতে চাই। তাই, বিতর্ক ও বিদ্বেষমুক্ত থাকার জন্য, ফিল করা সত্ত্বেও, সমসাময়িক বিষয়ে এনগেইজ হই না। এ বিষয়ে আমার no conflict with any authority শিরোনামে একটা লেখা আছে। পড়ে দেখতে পারো ভালো লাগবে আশা করি। ভালো থাকো। আমাদের জন্য দোয়া করো।

Muntasir Mahmud: আমি একমত স্যার। এমনিতেই আপনি যা করছেন তা না বুঝেই অনেকে বিরোধিতা করতেছে আপনার। সমসাময়িক বিষয়ে কথা বললে আপনাকে আগাতেই দিবে না। একজন মানুষ একাই সব কাজ সব দিক সামলাতে পারবে এই ধারণা তো ভুল। আবার কেউ সমসাময়িক বিষয়ে চুপ থাকা মানেই এই না যে, সে অন্যায়কে সাপোর্ট করছে। আমাদের বুঝার জন্যে আরো পরিপক্ক মন-মানসিকতা থাকা দরকার বলে মনে করি। আপনার জন্যে মন থেকে সব সময় দোয়া করি স্যার। আমি খুব অসুস্থ, আমার জন্যেও দোয়া কইরেন।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য/প্রশ্ন লিখুন

ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।

*