কেন আমি ‘নাস্তিকতা অধ্যয়ন কেন্দ্র’ নামে নতুন একটা উদ্যোগের বিষয়ে আগ্রহী

[ফেইসবুকের মেসেইজ অপশনে লোকজন আমাকে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করে। এমনই এক প্রশ্নের একটু আগে যে উত্তর দিলাম, ভাবলাম এই ধরনের বিষয়গুলো আমাদের অনেকেরই জানা দরকার। প্রশ্নকর্তার ব্যক্তিগত পরিচয় প্রাইভেসির ব্যাপার। কথাটা কী ছিল এবং আমি কী বলেছি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।]

*****

হ্যালো স্যার, কেমন আছেন? আপনি মে বি আমাকে চিনবেন না। আমি আপনার কিছু লেখা পড়েছি। ভালো লেগেছিল।

আচ্ছা, ইসলামের কোন কোন ব্যাপারগুলুর কারনে আপনি এই ধর্মকে বেছে নিয়েছেন? জানার খুব ইচ্ছা ছিল।

আমার বিশ্বাসের ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে গেলে বলব, আমার প্রচলিত কোন ধর্মেই বিশ্বাস নেই। আর ইশ্বরে বিশ্বাস নিয়ে কোন কথা বলতে চাই না। এইখানে আপনি চাইলে আমাকে অজ্ঞেয়বাদী ধরে নিতে পারেন। আমি মনে করি, প্রচলিত অর্থে ইশ্বর বলতে মানুষ যা বুঝে সেই ধরনের ইশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ কিংবা বাতিল করা কোনটাই সম্ভব নয়।

আর ধর্ম কেন বিশ্বাস করি না সেটার কারন হিসেবে বলবো, আমি কে, কোথা থেকে আসলাম, কেন আমি এখানে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমি আসলে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে চাই। ধর্মে বিশ্বাস করার মানে হল, আদম-হাওয়ার ঘটনা আমাকে বিশ্বাস করতেই হবে। না বিশ্বাস করলে ইমান থাকবে না, শাস্তি হবে। এইসব কথা আমার মধ্যে ভয় জাগানোর পরিবর্তে আসলে ধর্মের প্রতি আরো বিতৃষ্ণ করে দেয়।

আমি বিবর্তনে বিশ্বাস করি। বাট বিবর্তনে এসে আমার প্রশ্ন শেষ হয়ে গেছে এমন না। বিবর্তন জিনিষটাওতো কোন উন্নত সিভিলাইজেশন বা সাধারন মানুষ গড বলতে যা বুঝায় সেরকম কারো প্রোগ্রামড হতে পারে। অথবা এরকম কিছুও হতে পারে যেটা মানুষ এখনো কল্পনা করতে পারে না বা কোনদিন পারবেও না। আমি বিজ্ঞান ভালোবাসি ও বিজ্ঞানবাদী। কারন বিজ্ঞান এইগুলা সবই মাথায় রাখে ও উত্তর খোঁজে।

বিজ্ঞানের লিমিটেশন দেখায়ে অন্ধভাবে আদম-হাওয়া কিংবা ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে বর্ণনাকৃত অন্যান্য স্টোরিগুলো মেনে নেওয়া কোন সমাধান নয় আমার কাছে। তাছাড়া আমার কাছে এগুলা বোরিং লাগে। প্রশ্ন করার মাঝেই আনন্দ পাই। ধর্মতো আমারে এই ধরনের প্রশ্ন করারই অনুমতি দেয় না।

*****

উপরের এই কথাগুলোর উত্তরে আমি যা বলেছি তা হুবহু উদ্ধৃত করছি:

ইসলাম, যেটাকে তুমি ধর্ম হিসেবে বলছো, সেটাকে আমি আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম। ‘বেছে নিয়েছিলাম’ – কথাটা এভাবে বলছি এ জন্য যে, আমি মেট্রিক-ইন্টার পরীক্ষার পরেও, এমনকি জুমার নামাজও পড়তাম না। দেখতাম, পরীক্ষার পরে, বিশেষ করে রেজাল্টের আগে বন্ধুরা ঘন ঘন নামাজ পড়তো। আমি এমনকি, রোজাও রাখতাম না। এবং কখনও আমি ধর্মের কোনো কিছু শিখি নাই। যদিও আমাদের পরিবার ছিল ধর্মভীরু পরিবার। আমার বাবা-মা-ভাই-বোন আমাকে এগুলো শেখানোর এবং প্র্যাকটিস করানোর অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমি আমার মতো করে চলতাম।

ছোটবেলা থেকে আমি ছিলাম জীবনঘনিষ্ঠ। বলতে পারো, জীবনবাদী। নিজেকে, জীবনকে, জগতকে বোঝার চেষ্টা সবসময় করেছি। ইন্টার পর্যন্ত সায়েন্সের স্টুডেন্ট ছিলাম। তখনকার স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে ভালো স্টুডেন্টই ছিলাম। নিতান্তই জানার আগ্রহ থেকে ফিলোসফিতে ভর্তি হয়েছিলাম।

এ কথাগুলো এজন্য বললাম, আমার অতীতের সাথে তোমার বর্তমানের একটা মিল খুঁজে পাচ্ছি, তাই। আসলে আমাদের প্রত্যেককে নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়। সেটাই সঠিক পন্থা।

আর হ্যাঁ, ধর্ম বলতে তুমি যাকে দেখেছো, বুঝেছ, আমাদের সমাজের আলেম-ওলামা তথা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ, তারা যে ধরনের ধর্ম এবং ইসলামকে যেভাবে একটা ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করে, কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন ও জীবনবাদী কারো পক্ষে সেটাকে সমর্থন করা অসম্ভব-প্রায়। এর মাঝে আবার ভেজাল তৈরি করেছেন রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা। ইসলামকে যেভাবে একটা রাজনৈতিক ধর্ম হিসেবে তারা উপস্থাপন করে সেটা অনেকখানি স্ববিরোধী।

আমার কাছে ইসলাম একটি দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা। যেটাকে আমি জেনেছি সরাসরি পড়াশোনা করে। আমি সরাসরি কুরআনের অনুবাদ পড়েছি। সরাসরি হাদীসের গ্রন্থগুলো গল্প উপন্যাস পড়ার মতো করে থরোলি পড়েছি। এবং সীরাতের গ্রন্থসমূহও ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়ন করে বোঝার চেষ্টা করেছি। আলেম-ওলামা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সাথে সময় ও সুযোগ পেলেই নানা বিষয়ে জানতে চেয়েছি, মতবিনিময় করেছি। আই ওয়াজ অন অ্যা জার্নি।

আমি মনে করি, আমার ফেসবুক ওয়ালে যে কথাটা আছে সেটি অনেক বড় একটা সত্য কথা। কথাটা হলো “কথা বলতে দিতে হবে। চাই, প্রশ্ন করার অধিকার।” প্রশ্নটি যদি ভুলও হয়ে থাকে তারপরও সেই কথাটি বলতে দিতে হবে। সে কথাটি শুনতে হবে। তবে কথা হলো, সব প্রশ্ন সঠিক প্রশ্ন নয়। কিছু প্রশ্ন ভুল প্রশ্ন বা ক্যাটাগরি মিসটেক। কিছু প্রশ্ন সঠিক প্রশ্ন, যার সঠিক উত্তর ধারণ করার ক্ষমতা প্রশ্নকর্তার নাই। যেটাকে আমরা জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিতে limit of cognitive capacity বা potentiality হিসাবে বলে থাকি। ভুল প্রশ্ন বা জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রে প্রশ্নকর্তাকে সুন্দর যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে, কেন তার উত্থাপিত প্রশ্নটি ভুল; অথবা তার জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা কোথায় এবং কী কারনে।

এবার আসল কথায় আসা যাক। কুরআন কীভাবে মানুষকে অ্যাপ্রোচ করে সেটা যদি তুমি সরাসরি কোরান থেকে বোঝার চেষ্টা করো তাহলে তুমি দেখবা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার বিবেক, বুদ্ধি, জীবন ও অভিজ্ঞতা থেকে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে জানার এবং সত্যকে খুঁজে নেওয়ার জন্য বারবার বারবার বলেছেন। তাগিদ দিয়েছেন। বিশেষ করে মক্কী সূরা গুলোর এটি ডমিন্যান্ট ট্রেন্ড। সমস্যা হলো, আমরা ইসলাম শুরু করি ‘ফতেহ মক্কা’ থেকে। অথচ, এটি সুষ্পস্টভাবে এক অপরিহার্য ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে।

কথাটা পরিষ্কার, আদম-হাওয়া বা এক্স ওয়াই জেড ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি, তুমি, তোমার, আমার, আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অস্তিত্ব। আমাদের কগনিটিভ জার্নি শুরু হয় নিজেদের অস্তিত্ব বা আত্মসত্তার উপস্থিতির অনুভব এর মাধ্যমে। শেষ হয় এক পরম সত্তার উপস্থিতির উপলব্ধি এবং তাঁর প্রতি সমর্পিত হওয়ার মাধ্যমে। আস্তিক নাস্তিক প্রত্যেকেরই একই অবস্থা। প্রত্যেকের মধ্যে আছে kind of soul searching এর ইনহারেন্ট টেন্ডেন্সি। প্রত্যেকের মধ্যে ভিতরে ভিতরে কাজ করে এক ধরনের sense of transcendence। which is a kind of spirituality। কারো কাছে পরমসত্তা হলো পার্সোনাল গড। কারো কাছে পরম সত্তা হলো নিছকই ফিলোসফিক্যাল গড।

একজন নিরীশ্বরবাদী ‘প্রকৃতি’ নামক অনস্তিত্বশীল (?) অথচ সদা সক্রিয় একটা এনটিটি বা সত্তাকে যখন বারে বারে রেফার করে কথা বলেন তিনি যদি সেটা সম্পর্কে খোলামনে জানার চেষ্টা করেন তাহলে তিনি দেখবেন, তার নিরীশ্বরবাদী জ্ঞানজগতে ‘প্রকৃতি’ নামক এই যে mysterious phenomena বা রহস্যময় প্রপঞ্চ, সেটার ভূমিকা, বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রম ঈশ্বরবিশ্বাসীদের ঈশ্বর-প্রপঞ্চের হুবহু সমার্থক। কার্যত দু’টো অভিন্ন ফেনোমেনা। পার্থক্য হলো, ধর্মের ঈশ্বরকে এবাদত করা হয়। কিন্তু ‘প্রকৃতি’ নামক বিজ্ঞানবাদীদের এই ঈশ্বরকে সেভাবে অর্চনা করা হয় না।

মানুষ অন্তর্গতভাবেই বিশ্বাসী চরিত্রের। জ্ঞান মাত্রই বিশ্বাস। তবে বিশ্বাস মাত্রই জ্ঞান নয়। শুধুমাত্র সেই বিশ্বাসগুলো জ্ঞান হিসেবে বিবেচনার যোগ্য যেগুলো সত্যত-সমর্থিত ও যাচাইযোগ্য। আমাদের জ্ঞানতত্ত্বে যেটাকে বলে justified true belief। তোমাকে হেল্প করার মতো আমার অনেক লেখা, ভিডিও-বক্তব্য, অনেক কিছু আছে। এগুলোর লিঙ্ক দিয়ে তোমাকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না। ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করতে পারলে কথাগুলো আরো অনেক গুছিয়ে সুন্দর করে বলা যেত। যা হোক।

আমার অফিস রুম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবন ১০২ নম্বর কক্ষের দরজায় একটা কথা লিখেছিলাম বহুবছর আগে। কথাটা এখনো সেভাবেই সেখানে আছে। কথাটা কি জানো? সেটি হলো, “আসুন আপন আলোয় পথ চলি”।

আমি যেসব বিষয়ে পড়াই তার সবই হচ্ছে সমকালীন পাশ্চাত্য জ্ঞানতত্ত্ব এবং তার সাথে সম্পর্কিত নানা বিষয়। জ্ঞানতত্ত্বের ভাষায় বলতে গেলে কথাটা এভাবে বলতে হয়, even if you are right but you didn’t explore it, then it will not be knowledge for you. knowledge must be truth based and justified or justifiable. ব্যাপারটাকে আমি সাধারণত এভাবে বলে থাকি, knowledge must be achieved or acquired. It can’t be given. ‘Flexiloaded’ knowledge is not knowledge. at best, it could be a lucky guess.

সেজন্যই জানতে চাওয়া, প্রশ্ন করা এবং নিজের মতো করে চলা, এটি হচ্ছে প্রপার মেথডলজি, যে কোনো আদর্শের, আমার দৃষ্টিতে ইসলামেরও। আমাদের প্রচলিত সামাজিক ইসলামে যেটার কোনো সুযোগই নাই। আমাদের সমাজে প্রচলিত এই ডমিনেন্ট সামাজিক ইসলাম হলো repressive, dogmatic and mostly ritualistic। আমি যদি সরাসরি এবং খোলা মনে ইসলামের মৌলিক উৎসগুলো থেকে পড়াশোনা না করতাম তাহলে আমার অবস্থাও তোমার মতই হতো। হয়তোবা। ভালো থাকো। যোগাযোগ রেখো।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য/প্রশ্ন লিখুন

ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।

*