যুক্তি পছন্দ নয়? কী করবেন, যুক্তি থেকে তো মুক্তি নাই…

এক যুক্তি দিয়ে আরেক যুক্তিকে খণ্ডন করা যায়। কিন্তু, বিষয় যা-ই হোক না কেন, যুক্তির অপরিহার্যতাকে আপনি কোনোভাবেই খণ্ডন করতে পারবেন না। এমনকি, যদি তা পারেনও, তাতে করেও যুক্তি প্রক্রিয়ার কোনো অসুবিধা নাই। কেননা, যুক্তির ‘অসারতা’ প্রমাণের জন্য আপনি তো যুক্তিকেই ব্যবহার করলেন! সেজন্যই ‘নাস্তিকতা অধ্যয়ন কেন্দ্র’র শ্লোগান ঠিক করেছি– ‘যুক্তির বাইরে কিছু নয়, বুদ্ধির অনুকূলে সর্বদা’।

ব্যাপারটা মজার কিংবা মর্মান্তিক, যুক্তি শুধু উন্নততর যুক্তি দিয়েই খণ্ডিত হতে পারে।

আমরা জানি, সত্য আর মিথ্যার সম্পর্ক হলো সমতলধর্মী বা horizontal। হয়তো সত্য হবে, না হয় মিথ্যা হবে। এরা পরস্পরকে রিপ্লেস করে। অন্যদিকে উত্থাপিত যুক্তির সাথে পাল্টা যুক্তির সম্পর্ক হলো ক্রমসোপানমূলক বা hierarchical। একই সাথে সব যুক্তি বিদ্যমান থাকতে পারে। ব্যাপার হলো, সব যুক্তি মানসম্মত বা ভালো নয়। কিছু যুক্তি নিম্নমানের। কিছু যুক্তি উচ্চমানের। এনটায়ার লজিকে তাই সত্য-মিথ্যা না বলে সব সময়ে বলা হয়, বৈধ যুক্তি বা অবৈধ যুক্তি, ভালো যুক্তি অথবা খারাপ যুক্তি, শক্তিশালী যুক্তি কিংবা দুর্বল যুক্তি।

ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করেছে?” – কয়েকদিন আগের এই পোস্টে একজন পাঠক আজ মন্তব্য করেছেন, “without logic Allah Is God & Creator of the world.”

উত্তরে আমি লিখেছি: আপনি বলছেন লজিক ছাড়াই আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকর্তা। হ্যাঁ, আপনার কথা একশ ভাগ সঠিক। আল্লাহ তায়ালার কাছে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকর্তা হওয়ার জন্য কোনো মানুষের স্বীকৃতি পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টা অর্থহীন ও অপ্রাসঙ্গিক। এটা সত্য।

কিন্তু আল্লাহর দিক থেকে আল্লাহ কেমন হতে পারেন তা নিয়ে আপনি আমি কেন মাথা ঘামাবো? আমরা মূলত নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই সমস্যাগ্রস্ত ও চিন্তিত। আমাদের মধ্যে চিন্তা আসে, আমরা কোথা থেকে এলাম? এই জগত কোথা থেকে এলো? এই জগতের সাথে আমাদের প্রকৃত ও ন্যায্য সম্পর্ক কী? শুরু কোত্থেকে? এসব কিছুর শেষ কোথায়?

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জন্য আমরা চিন্তিত। আল কোরআন আমাদের এই প্রশ্নগুলোরই এক রকম উত্তর দেয়। যাকে আমরা সংক্ষেপে ইসলাম হিসেবে জানি। তাই তো?

এবার আসেন আল-কোরআনে এসব বিষয়ে কী বলা হয়েছে, কেমন করে বলা হয়েছে, সেদিকে আমরা একটু লক্ষ করি। আমরা দেখি, আল কোরআনের পাতায় পাতায় আল্লাহ তায়ালা নানা বিষয়ে যুক্তির পর যুক্তি দিয়ে গেছেন। আপনি জানেন, কোরআনের অধিকাংশ সূরা ও আয়াত হলো মক্কী যুগের। সেইসব সূরা ও আয়াতসমূহে কী বিষয়ে কী কী বলা হয়েছে? কীভাবে বলা হয়েছে, একটু স্মরণ করেন।

তাহলেই বুঝবেন, ইসলামের সাথে যুক্তির সম্পর্ক কী বা কতটুকু। আমি শুধু আপনাকে এ বিষয়ে চিন্তা করার পথ বাতলে দিলাম। সাথে এতটুকুও মনে রাখবেন– আপনি যখন বলবেন, ‘যুক্তির দরকার নাই’, তখন আপনাকে অথবা যিনি এমনটা বলবেন তাকে কোনো না কোনো যুক্তি দিয়েই বলতে হবে কেন তিনি মনে করছেন, যুক্তির দরকার নাই। তাহলে দিনশেষে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো…?

ফেসবুকে প্রদ্ত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

মাহমুদুল হাসান ফয়সাল: সক্রেটিসকে আমার ভালো লাগে। কারণ, তিনি সবকিছুকে যুক্তির নিরিখে বিচার করতেন। যুক্তিতে টিকলে গ্রহণ করতেন, না হলে নাকচ করে দিতেন। চিন্তাই শক্তি, যুক্তিতেই মুক্তি।

Mohammad Mozammel Hoque: যুক্তি লাগবে না, এইটা বলার জন্যও কোনো যুক্তি থাকা চাই।

Rafsan Munsi: যুক্তির কি সীমাবদ্ধতা আছে? থাকলে সেটার দৌড় কতটুকু?

Mohammad Mozammel Hoque: ধরে নিলাম, যুক্তির সীমাবদ্ধতা আছে। তাই, এককভাবে যুক্তির উপর নির্ভর করা ঠিক না। যুক্তির সীমাবদ্ধতা দেখানোর জন্য যুক্তিই খাড়া করা হইলো। তাহলে ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াইলো?

রুপক ইবরাহীম: যুক্তির দৃষ্টি দিয়ে একটা কল্পনাকে বাস্তবতায় রূপ দেয়া যাক। ধরা যাক, একটা সাপ তার নিজের লেজ হতে শুরু করে তার কোমর, এরপর তার পেট, এরপর তার গলা গিলতে গিলতে শেষে এসে তার মাথা পর্যন্ত পৌঁছালো। কিন্তু সাপটা নাছোড়বান্দা। সে ঠাই নিল সে আজ তার পুরোটা গিলে খাবে।

তো রাফসান মুনসি, এবার আবার প্রথম থেকে একবার বাক্যটা পড়ুন। এবং কল্পনায় সেই বাক্যাটাকে একটা ভিডিও চিত্রে রূপ দিন। ভাবুন আপনি সাপের গিলে খাবার মুহুর্তটাকে লুকিয়ে লুকিয়ে পর্যবেক্ষন করছেন। এবং আমাকে জানান যে আপনি কতটুকু পর্যন্ত সেই কল্পিত চিত্রটাকে যুক্তির মাধ্যমে দেখতে পেলেন? সেই গলা পর্যন্তই এসে আপনি থেমে যাবেন। আপনার কল্পনায় জন্ম নেয়া সেই ভিডিও চিত্রটি সেখানেই অন্ধকারে রূপ নিবে। অথচ কি আশ্চর্য আমরা কল্পনায় চাইলে মহাকাশ ভেদ করে সাত আসমানে চলে যেতে পারবো কোনো রকম যুক্তিবিদ্যা ছাড়াই। সেখানে সাপের গিলে খাবার মুহুর্তাটাকে যুক্তি দিয়েও আমরা আর কল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলাম না। তখন প্রশ্নটা এমন দাঁড়াবে, সে যা গিলবে সেটাই তো তার মুখ তাহলে কোন মুখে তা গিলবে? এটাই হলো যুক্তির সীমাবদ্ধতা। এবং কল্পনারো। অতএব যুক্তি উভয় প্রক্রিয়ায় হেরে গেল। এবং সে নিজেকে নিজেই হারালো।

Mohammad Mozammel Hoque: যুক্তির সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে নেয়াটাও তো যুক্তিরই দাবি। তাই না? যুক্তি বিরোধিতার সমস্যাটা এখানেই। পর্যবেক্ষণ আমাদের যুক্তির দিকে ঠেলে দেয়। কারণ, পর্যবেক্ষণের রয়েছে সীমাবদ্ধতা। যুক্তি সে তুলনায় বৃহত্তর পরিসরের। কিন্তু যুক্তিরও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। সে তুলনায় কল্পনার অবকাশ অনেক বেশি। যুক্তির মিশেলে বা সমর্থনে যে কল্পনা তাকে আমরা বলি বিশ্বাস। বিশ্বাসের সমর্থনে যে যুক্তিকে সেট করা হয় তা যদি দুর্বল হয় তখন বিশ্বাসটা ভুল হবে।

পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও কল্পনা – এসব কিছুরই নিজস্ব ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। বিশ্বাস হলো এসব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। তাই, বিশ্বাসটা সঠিক হওয়া জরুরী।

তরুণদের কথার মাঝখানে এসে কিছু বলে ডিসটার্ব করার জন্য দুঃখিত।

রুপক ইবরাহীম: স্যার, আমরা তরুণ। এবং আমি যদি সোফি হই তবে আপনি সেই দার্শনিক। অন্তত আমার জন্য। আপনার থেকে আমি যতটুকু উপকৃত হয়েছি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করতে পারবো না। যদি আপনি আমাদের ডিস্টার্ব না করেন তবে আমরা অন্ধই থেকে যাবো। ভালোবাসা স্যার। 😍

Umme Kawsar: যুক্তির সীমানা মানুষের জানা পর্যন্তই সীমিত। এটি আল্লাহর জন্য নয়। মানুষ ০.৫% এর বেশি এখনও জানে না। সুতরাং যুক্তির দোহাই আমরা সব ক্ষেত্রে দিতে পারি না।

Mohammad Mozammel Hoque: এই যে আপনি যুক্তি দিয়ে বললেন, “মানুষ বড়জোর ০.৫% এর বেশি জানে না। তাই…।” শেষ পর্যন্ত কি যুক্তির বাইরে যেতে পারলেন?

Umme Kawsar: আমি তো তাই বলেছি। যুক্তির লিমিটেশনের কথাই তো বললাম।

Mohammad Mozammel Hoque: যুক্তির সীমাবদ্ধতা আছে, এই যুক্তিতে আমাদের উচিত যুক্তির উপর এককভাবে নির্ভর না করা। এই যে কথাগুলো আমি বললাম, আপনি খুব সম্ভবত এটাই বুঝাইতে চাইছেন। তা যদি হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত আপনি কি যুক্তির বাইরে যেতে পারলেন?

আবার খেয়াল করেন। “যুক্তির সীমাবদ্ধতা আছে, এই যুক্তিতে আমাদের উচিত যুক্তির উপর এককভাবে নির্ভর না করা।” – এইটুকু নিজেই একটা যুক্তি নয় কি?

সেই জন্যই বলেছি, যুক্তির মধ্যে আছে ভালো যুক্তি, খারাপ যুক্তি, শক্তিশালী যুক্তি, দুর্বল যুক্তি, বৈধ যুক্তি আর অবৈধ যুক্তি। যুক্তির মোকাবিলায় যুক্তি ছাড়া কিছু নাই। হতে পারে না।

যদি বলেন, যুক্তি বনাম যুক্তি ছাড়া আর কিছু। আমি কখনোই ‘যুক্তি ছাড়া আর কিছু’র পক্ষে যাবো না। যারা যুক্তিবিরোধী, আমি তাদের বিরোধী।

একটা উদাহরণ দিচ্ছি। সিঁড়ি বা লিফট দিয়ে আমি ছাদে উঠলাম। সেখান হতে হেলিকপ্টারে করে আকাশে উড়লাম। তো, লিফট আমাকে আকাশে ওড়াতে পারে না। তাই বলে কি আমি বলতে পারি, সিঁড়ি বা লিফটের দরকার নাই? যুক্তিটা হচ্ছে সিঁড়ি। আর বিশ্বাস হচ্ছে কপ্টার।

একটার পরিবর্তে আরেকটা হলো এক ধরনের সমতলধর্মী সম্পর্ক। মনে করেন, একটা চেয়ার আছে। সেখানে আপনি বসবেন। অথবা, আমি বসবো। এইটা হইলো সমতলধর্মী পারস্পরিক সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য। অথবা, হতে পারে, উপরে একটা আসন। আর নিচে একটা আসন। ট্রেনের স্লিপিং বার্থের মতো। তাতে করে দুজন উপরে নিচে অবস্থান নিয়ে একই কক্ষে একই সাথে ভ্রমণ করতে পারে। দ্বিতীয় ধরনের সম্পর্ক হলো ক্রমসোপানমূলক সম্পর্ক।

যুক্তি আর বিশ্বাসের সম্পর্ক ক্রমসোপানমূলক। বিশ্বাসের মধ্যে আছে যুক্তি। আর যুক্তির মধ্যে থাকে বিশ্বাস। এই দুইটার সম্পর্ক নন-বাইনারি। রেসিপ্রোকাল।

Mohammad Mozammel Hoque: যুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে কেউ একজন ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’ – এই ডিলেমাটাকে নিয়ে এসেছেন। উনাকে বলেছি–

‘ডিম আগে না মুরগি আগে’ – এই সমস্যা সমাধান করতে পারছি না বিধায় আমরা মনে করতে পারি: (১) ডিম আগে, কেননা…। অথবা, আমরা মনে করতে পারি: (২) মুরগী আগে। কারণ…। অথবা, আমরা এও মনে করতে পারি: (৩) এটি কোনো সমস্যাই নয় বা এর কোনো উত্তর নাই। এই তিনটা ‘উত্তর’ই ভুল।

ডিম আগে? না, মুরগি আগে? – এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হচ্ছে: এ বিষয়টা আমাদের জ্ঞানের আওতার বাহিরে। অর্থাৎ, আমাদের জ্ঞান যতটুকু পর্যন্ত জানতে পারে এটি তার অতিবর্তী বা beyond-এ।

সসীম সত্তা হওয়ার কারণে আমরা সবকিছু জানতে পারি না। তাই আমাদের অজানা বিষয়ে সঠিক জ্ঞান লাভের জন্য আমরা নির্ভরযোগ্য কাউকে খুঁজবো। এরপর তিনি বা সেই কর্তৃপক্ষ যা বলবে তা-ই আমরা মেনে নেব। যেমন করে আমরা বিশেষজ্ঞদের কথাকে চোখ বুঁজে মেনে নিই।

আমরা যুক্তির সহায়তায় এভাবে আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার ত্রুটিকে কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করি। দৈনন্দিন জীবন থেকে বিজ্ঞান কিংবা ধর্ম, সব বিষয়েই আমরা এই মেথডলজিকে অনুসরণ করি। ব্যাপারটা সিম্পল। “না জানলে যিনি জানেন তার কাছ হতে জেনে নাও।”

Enamul Haque: পৃথিবীর প্রতিটি বিষয়ই সীমাবদ্ধ। যুক্তি থেকে শুরু করে জড় কোনো বস্তুও এর অন্তর্ভুক্ত। যখনই কোন বিষয়কে আর খণ্ডানোর মতো রিজনিং করার ক্ষমতা মানুষের থাকে না, তখনই মানুষ বলে বসে– আর যুক্তি প্রয়োজন নেই, আর এর কারণ সাপেক্ষে যুক্তিটাই একটু আগে বলে আসলাম ।

সৃষ্টিকর্তা নিয়ে বিভ্রান্তি ও মায়াজাল তৈরি হয় যখন মানুষ যুক্তির সাথে বিশ্বাসকে গুলিয়ে ফেলে। বিশ্বাস কোনো অবস্থাতেই নিরেট যুক্তিনির্ভর সত্য প্রতিপাদ্য কোনো বিষয় নয়। তবে বিশ্বাস অবশ্যই যুক্তি থেকে জন্মানো এক অঙ্কুর।

Mohammad Mozammel Hoque: পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিকে ছাড়িয়ে (exhausted করা অর্থে) বিশ্বাস আর পর্যবেক্ষণ ও যুক্তির মোকাবিলায় (binary বা either-or অর্থে) বিশ্বাস – এই দুই বিশ্বাস এক নয়। আমি প্রথম ধরনের বিশ্বাসের লোক। দ্বিতীয় ধরনের বিশ্বাস হলো অন্ধ বিশ্বাস।

যাচাইকৃত সত্য বিশ্বাস হলো জ্ঞান। অসত্য ও যাচাইবহির্ভূত বিশ্বাস হলো নির্বিচারমূলক বা অন্ধবিশ্বাস।

Enamul Haque: বিশ্বাস আসলে ব্যাপক একটি তত্ত্ব। ব্যক্তিভেদে বিশ্বাসের রকমভেদ বা তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। বিশ্বাস যুক্তিনির্ভর হোক আর সেটা অন্ধ হোক সবক্ষেত্রেই যা বিদ্যমান থাকে তা হচ্ছে নিদিষ্ট অনুপাতে কিছু ‘কারণ’ ।

তবে বিশ্বাসকে কোনো অবস্থাতেই যুক্তি ও যাচাইয়ের মাধ্যমে সত্য বা অসত্য কোনো স্টেটে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর নয় । (সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কিত কথনে)

Mohammad Mozammel Hoque: সৃষ্টিকর্তা নিজেই তো বিশ্বাসের পক্ষে কুরআন শরীফের পাতায় পাতায় যুক্তি দিয়ে গেছেন। যুক্তি দিয়ে, উদাহরণ দিয়ে, বুদ্ধির দাবি হিসেবে উপস্থাপন করে, মানুষকে তিনি তাঁর ওপর ঈমান আনার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। সূরা রহমানসহ বড় বড় অনেকগুলো সূরা এই যুক্তি-বুদ্ধি চর্চার উদাহরণ।

Enamul Haque: সৃষ্টিকর্তার যুক্তিগুলোকে আমরা জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আওতায় এনে খণ্ডাতে পারি কিন্তু এসব খন্ডন যেসব বিশ্বাসের দিকে আমাদের ধাবিত করে সেইসব ‘বিশ্বাস বা ঈমান’-এর সত্যায়ন আমাদের পক্ষ হতে দেয়া কোনোভাবে সম্ভব নয়।

তাই তো এটা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। জ্ঞানগত কোনো বিষয় নয়।

Mohammad Mozammel Hoque: আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, জ্ঞান আর বিশ্বাস পরস্পর বিপরীত?

Enamul Haque: ‘বিরোধী’ বলতে কি বোঝানো হচ্ছে সেটা পরিষ্কার করতে হবে।

আমার মতে, বিশ্বাস ও জ্ঞান দুটি ভিন্ন বিষয় যা বিভিন্ন আঙ্গিকে একে অপরের সাথে জড়িত। মানুষ তার জীবদ্দশায় নানানভাবে জ্ঞান অর্জন করতে থাকে সেই সাথে সাথে বিশ্বাসের পরিধিও বাড়তে থাকে। জানাশোনা বা জ্ঞান থেকে যেই বিশ্বাসের উৎপত্তি হয় তা কখনো কখনো জাস্টিফাই করা যায়। কিছু থাকে কখনোই যায় না।

Shamim Ahsan: আমি এবং আমরা বেঁচে থাকব কি থাকব না… এটার পিছনে কি যুক্তি????

Mohammad Mozammel Hoque: যুক্তি হলো জ্ঞানের হাতিয়ার। আর জ্ঞান হলো প্রত্যেক সত্তার নিজ নিজ সামর্থের ব্যাপার। কেউই সামর্থের বাইরে জ্ঞানার্জন করতে পারে না। তাই সব যুক্তি দেয়া হলেও সব যুক্তি আপনি ধারণ করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে আপনার ধারণাতীত যুক্তিকে আপনি যুক্তি নয় বলে মনে করবেন। সেজন্য যুক্তির দাবি হচ্ছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ or higher authority-কে স্বীকার করে নেয়া। যেমন আপনার প্রশ্নটা। আমাদের এই জীবন ও জগতের থাকা না-থাকার যুক্তি কি – সেটা আমরা জানি না। তার মানে এই নয়, এটার কোনো যুক্তি নাই। বরং আমাদের সত্তাগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা এইসব বা এই ধরনের বিষয়গুলির সঠিক জ্ঞান যুক্তিতে ধারণ করতে পারি না। সে জন্য এসব বিষয়ে এনগেইজ হওয়া আমাদের জন্য category mistake।

Shamim Ahsan: স্যার, অব্যশই আমি এটা বিশ্বাস করি। আমি শিখবো। আমার একটা concept যুক্তি আমাদের চিন্তা-চেতনার পরিধির উপর নির্ভর করে!

Mohammad Mozammel Hoque: আমাদের চিন্তা-চেতনা তথা আমাদের জ্ঞানের যে সীমাবদ্ধতা সেটা বুঝতে পারাটা কিন্তু একটা বিরাট ব্যাপার। যুক্তির সীমাবদ্ধতা যে আছে সেটা আমরা বুঝতে পারি, স্বীকার করি, তাতে আমাদের কোনো ডিসক্রেডিট নাই। বরং, নিজের অজ্ঞতাকে গায়ের জোরে অস্বীকার করা হলো গোঁয়ার্তুমি ও অন্ধবিশ্বাস। বিজ্ঞানবাদীরা যা করে।

Sheikh A Ahmed: আমি যুক্তির পক্ষের মানুষ, কিন্তু ‘যুক্তিতেই মুক্তি মিলবে’ এই প্রবচনে খুব বেশি বিশ্বাস রাখতে পারি না। কেন পারি না তার একটি উদাহরণ দিয়ে পরিস্কার করছি।

৪০ বছর বয়সে আবিষ্কার করলেন আপনার মাথার একটা চুল পেকে গেছে। এখন বলুন দেখি ৮০ বছর বয়সে কটা চুল পাকবে?

কিংবা পদ্মা সেতুর একটি স্প্যান বসে গেছে এবং ৫১ পার্সেন্ট কাজ শেষ হয়ে গেছে। যুক্তি দিয়ে বললে দুটো স্প্যান বসলে তো সেতুর কাজ শেষ হয়ে যাবার কথা!

আমি বিশ্বাস করি ‘মুক্তি’, যাকে আমরা ইসলামী পরিভাষায় ‘হেদায়াত’ বলি, সেটা গডের পক্ষ থেকে একটি গিফট। এটা গড যাকে খুশি তাকে দেন। তিনি কেন এই গিফট রামকে না দিয়ে রহিমকে দিলেন এটা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা বেশ কঠিন বটে।

তবে তারপরেও বলবো যুক্তির অনুশীলন আমাদের ভীষণ দরকার। কেননা কেবলমাত্র যুক্তি দিয়েই আমি বুঝতে পারব আমার সীমাবদ্ধতা কোথায়। আমার নিজস্ব জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বুঝে আসার পরেই আমি উচ্চতর জ্ঞানের দ্বারস্থ হবো এবং নিজেকে সমর্পণ করার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারব। হেদায়েতের যোগ‍্য হবার জন্য সেটাও একটা পূর্বশর্ত বটে।

Mohammad Mozammel Hoque: ৪০ বছর বয়সে আপনার যতগুলো চুল পেকেছে ৮০ বছর বয়সে সে তুলনায় কতগুলো চুল পাকবে সেটা পর্যবেক্ষণের ব্যাপার, যুক্তির ব্যাপার নয়। তবে যুক্তি বলবে, আপনি যদি আরো ৪০ বছর বেঁচে থাকেন অর্থাৎ ১২০ বছর বেঁচে থাকেন তবে সেই বয়সে বা তখন ডেফিনেটলি আপনার সব চুলগুলো পেকে যাবে। যুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে আপনার মতো সবাইকেই কোনো না কোনো যুক্তির আশ্রয়ই শেষ পর্যন্ত নিতে হয়। যদিও সেগুলো হতে পারে ভুল যুক্তি কিংবা দুর্বল যুক্তি। যুক্তি বলতে কী বোঝায় সেটা না বোঝাটাও অন্যতম যুক্তির সমস্যা। কিছু মনে করবেন আশা করি।

Sheikh A Ahmed: আমি তো শুরুই করলাম যে আমি যুক্তির পক্ষের মানুষ। যুক্তির বিরোধিতা করলাম কোথায়? যুক্তিতে মুক্তি মিলবে ধারণাটা যে সর্বাংশে সত্য নয় সেই বিষয়ে আমি আলোকপাত করেছি মাত্র। আমার মন্তব্য শেষ না হতেই যুক্তি ছেড়ে দিলেন! যুক্তিবাদী আজ লাঠি-বল্লম-সড়কি সব নিয়ে মাঠে নেমেছে। সবাই সাবধান। হা হা।

Mohammad Mozammel Hoque: সময় মিলাইয়া দেখেন। আপনার কথা শেষ হওয়ার পরই তো আমি মন্তব্য করলাম।

Sheikh A Ahmed: ধন্যবাদ। আমি আপনার প্রস্তাবিত শ্লোগানের মধ্যে কিঞ্চিত দুর্বলতা খুঁজে পাচ্ছি।

“যুক্তির বাইরে কিছু নয়, বুদ্ধির অনুকূলে সর্বদা।”

স্লোগানের দ্বিতীয় অংশ নিয়ে আমার আপত্তি আছে। কোনো কিছু যদি বুদ্ধির অনুকূলে না হয় তাহলে কি করবেন, ফেলে দিবেন? নবী মূসা (আ.) ও খিযিরের (আ.) ঘটনায় যে বালকটিকে কোনো কারণ ছাড়াই হত্যা করলেন বলে কোরআনে উল্লেখিত আছে তা কীভাবে বুদ্ধির অনুকূলে যায়! এটাকে ব্যাখ্যা করতে হলে আপনাকে অবশ্যই beyond বোধির দ্বারস্থ হতে হবে। যা সাধারণের বুদ্ধির অনুকূলে নয়।

Mohammad Mozammel Hoque: একজনের জন্য যা বুদ্ধির অনুকূলে অন্যজনের জন্য তা অনুকূল নাও হতে পারে। এর কারণ হলো, এই দুইজনের সত্তাগত কিংবা ক্ষমতার পার্থক্য। খিজির আলাইহিস সালাম যতটুকু জানতেন সে আলোকে উনি যা করেছেন তা উনার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছে। সঠিক কারণ না জানার কারণে মুসা আলাইহিসসালামের কাছে একই বিষয় অযৌক্তিক মনে হয়েছে। অতএব, ব্যাপারটা এই দাঁড়ালো, যেটা আমরা জানি না, প্রয়োজন না থাকলে অযথা সেটা জানার চেষ্টা করবো না। আমরা জানি না অথচ আমাদের জানা প্রয়োজন, ব্যাপারটা যদি এমন হয় তাহলে আমাদের উচিত জানার চেষ্টা করা। কিন্তু ব্যাপারটা যদি এমন হয়– আমরা জানি না অথচ জানা দরকার, কিন্তু জানার চেষ্টা করার সময় বা সামর্থ্য আমাদের নাই; তখন আমাদের উচিত এ বিষয়ে কেউ জানে কি না, তা জানার চেষ্টা করা এবং তেমন নির্ভরযোগ্য কারো উপরে সংশ্লিষ্ট বিষয় ভরসা করা। জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনায় এটাকে বলে testimonial knowledge। ঘটনাক্রমে আগামীকাল সাড়ে ১১টায় এ বিষয়ে আমি একটা ক্লাস নেবো। ডেভিড হিউমের empiricism-এর সাথে testimony’র সম্পর্কের উপরে। ফেসবুকে ‘দর্শন নামে আমার একটা পেইজ আছে। সেখানে গতকাল এ বিষয়ে ১২ মিনিটের একটা ভিডিও আপ করেছি। সময় থাকলে চেক করে দেখতে পারেন।

বিশেষজ্ঞের উপর ভরসা করা আমাদের যুক্তি-বুদ্ধি দাবি।

Sheikh A Ahmed: চমৎকার বলেছেন। আমি নিশ্চয়ই আপনার উদ্দেশ্য পূরণে সহায়তা করছি। কারণ এটাই আপনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল যে বিভিন্ন বিষয়ে লোকজন কথা বলবে, প্রশ্ন করবে, ইস্যু তুলে আনবে এবং সবাই মিলে আলোচনা করবে। এটা যারা পড়বে তাদের প্রত্যেককেই কিছু না কিছু উপকৃত হবে। যেমন আমি নিজেও উপকৃত হচ্ছি।

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য/প্রশ্ন লিখুন

ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।

*