স্রষ্টা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের ভরকেন্দ্র

ফেইসবুক মেসেঞ্জারে একজন জানতে চেয়েছেন,

স্রষ্টাকে কি আমরা স্বার্থপর বলতে পারি? যেমন, তিনি বলেছেন তার ইবাদত করতে। না করলে শাস্তি দিবেন। তাহলে এখানে কি তার স্বার্থপরতা প্রকাশ পেল?

আমার উত্তর:

হ্যাঁ, তাঁর দাসত্ব না করলে তিনি শাস্তি দেন বা দিবেন। তাহলে এমন সত্তাকে স্বৈরাচারী বা স্বার্থপর বলা যেতেই পারে, কিংবা বললে কোনো অসুবিধা নাই, বরং বলাই ভালো। তাহলে আল্লাহ কি স্বৈরাচারী ও স্বার্থপর?

না।

কেননা, ‘স্বৈরাচারী’ বা ‘স্বার্থপর’ শব্দগুলোর মধ্যে এই সেন্স কাজ করে যে তার কথা ছিলো নিজ দায়িত্ব পালন করা ও সে মোতাবেক কিছু কর্তৃত্বের অধিকার ও অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করা। তা না করে সেই সত্তা (যেমন– কোনো শাসক) যখন অধীনস্তদেরকে যাচ্ছেতাইভাবে পরিচালনা করেন বা নিয়মবহির্ভূতভাবে কোনো অন্যায় হুকুম দেন, তখন সেই ব্যক্তিকে আমরা স্বৈরাচারী বা স্বার্থপর বলতে পারি। বরং বলাটাই যুক্তিসংগত।

এখন দেখা যাক, স্রষ্টার সাথে (আমরা এখানে আল্লাহও বলতে পারি) বান্দার সম্পর্ক এ রকম কিনা। বাহ্যত তা-ই। কারণ, আল্লাহ মানুষকে এবাদতের হুকুম করেছেন। না করলে, অর্থাৎ তিনি সন্তুষ্ট না হলে তাঁর হুকুম অমান্যকারীদের দোযখে পোড়ানোর ‘হুমকি’ দিচ্ছেন। তাও আবার অনন্তকাল। এখানে ভালোমন্দের একমাত্র মাপকাঠি তিনি নিজেই। তিনিই অল ইন অল। তাহলে নিরীহ বান্দা হিসাবে আমাদের ‘দোষ’ অথবা উপায় কী?

এই প্রশ্নগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোকে ‘ধর্মের’ দোহাই দিয়ে থামিয়ে দেয়ার চেয়ে ডিল করাকে‌ই আমি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। বরঞ্চ, এ ধরনের ‘অস্বস্তিকর’ প্রশ্নকে মোকাবিলা মাধ্যমেই তাওহীদের সঠিক বুঝ লাভ করা সম্ভব বলে মনে করি।

১.

প্রথম কথা হলো, স্রষ্টা বা ঈশ্বর বলতে আমরা কী বুঝি, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা। সমর্থন অথবা নাকচ করার প্রসংগ পরের ব্যাপার। স্রষ্টা বা ঈশ্বর বা আল্লাহ হলেন এমন অনন্য সত্তা যার সাথে কারো কোনো তুলনা নাই। তিনি একক। তা-ই যদি হয়, তাহলে আমাদের পরস্পরের সাথে পরস্পরের যে রকম দায়িত্ব, কর্তব্য, অধিকার ও সুবিধা প্রাপ্তির ব্যাপার থাকে, তা আদতে স্রষ্টার সত্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। স্রষ্টা যদি আমাদের মতো শাসক-শাসিত সম্পর্কের কেউ না হন, তিনি যদি আমাদের কল্পনাতীত ও অজ্ঞেয়ই হোন, তাহলে আমাদের সাথে লেনদেনের কোনো ব্যাপার এবং তাতে ঘাটতি বা বেশকম হওয়ার কারণে তাঁর পক্ষে জুলুমবাজ ও স্বার্থপর হওয়াটাও অসম্ভব। তাই না?

স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্ক হলো নিরঙ্কুশ কর্তা ও নিরঙ্কুশ অধীনস্তের সম্পর্ক। তাই সমধর্মী সম্পর্কের জন্য প্রযোজ্য ন্যায়নীতি কিংবা স্বার্থপরতা বা পরার্থপরতার মতো নৈতিক মানদণ্ডসমূহ তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে বিবেচনাযোগ্য না হওয়াটাই তো যুক্তিসংগত। বলাবাহুল্য, শাসক ন্যায়পন্থী বা স্বৈরাচারী, পরার্থপর বা স্বার্থপর হওয়াটা বিবেচনাযোগ্য হওয়ার কারণ হলো শাসক এবং তার অধীনস্তরা আদতে একই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। যেমন– তারা সবাই মানুষ শ্রেণীর জীব।

২.

দ্বিতীয় পর্যায়ে যা বলতে হয় তা অধিকতর ‘বৈপ্লবিক’। আসলে স্রষ্টার তরফে ব্যাপারগুলো কেমন, তা আমরা জানি না। বস্তুত আল্লাহর দিক থেকে আল্লাহ কেমন, তা আমরা ভাবতেও পারি না। আল্লাহকে আমরা জানি আমাদের তরফ থেকে, আমাদের অবস্থান থেকে। অন্য কথায়, সৃষ্টির অস্তিত্বের ব্যাখ্যা বা কারণ হিসাবে আমরা স্রষ্টা সম্পর্কে ধারণা করি। তাই, স্রষ্টা সম্পর্কিত আমাদের ধারণা আমাদের মানবিক অবস্থানের নিরিখেই নির্মিত।

সৃষ্টির অস্তিত্ব ব্যতীত স্রষ্টার দয়াবান বা কঠোর হওয়ার কোনো প্রসংগ হয় না। স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিকর্মের সাথে সম্পর্কসূত্রে ক্ষমাশীল বা শাস্তিদাতা হয়ে উঠেন। বিনা সৃষ্টিতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি ক্ষমাশীল বা কঠোর হওয়ার ধারণা যুক্তিবুদ্ধিবিরোধী বা counter-intuitive। এভাবে আল্লাহর যত গুণাবলী সম্পর্কে আমরা জানি, তা সবই আমাদের অর্থাৎ মানুষের দিক থেকে বিবেচনা করতে হবে। আল্লাহর দিক থেকে তাঁর সত্তা ব্যতীত সবই অস্তিত্বহীন ও অর্থহীন। তারমানে, আল্লাহ যেভাবে স্বয়ং অস্তিত্বশীল, আত্মনির্ভরশীল ও সক্ষম, তিনি ছাড়া আর কোনো কিছুই সে রকম নয়। জগত আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ জগতের ওপর নির্ভরশীল নন। তাই জাগতিক কোনো ন্যায়-মানদণ্ডের নিক্তিতে আল্লাহকে মাপতে যাওয়া আল্লাহর অস্তিত্ব ও সত্তাকে অস্বীকার করারই শামিল, ইসলামের তাওহীদ ধারণা অনুসারে যদি আমরা ব্যাপারটাকে দেখি।

তৎসত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর ইবাদত করার জন্য বলেছেন। আদেশ করেছেন। সে আদেশ পালন না করলে শাস্তি দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। শাস্তি থেকে বাঁচার চেষ্টা করার জন্য বলেছেন। সতর্ক করেছেন। এসবসহ কোরআন-হাদীসের বিভিন্ন দ্ব্যর্থহীন রেফারেন্সের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর এক প্রকার মানবিক ধরনের ধারণা পাই। এগুলো যেহেতু আল্লাহই স্বয়ং বলেছেন তাই তা সব সত্যি। যদিও এ ধরনের ‘মানবসুলভ’ সম্পর্কসূত্রগুলোর স্বরূপ আমরা সঠিকভাবে জানি না এবং আদৌ তা জানতে পারি না। এবং এই না জানাটাই আমাদের জন্য যুক্তিসংগত।

কারণ, আমরা তো বান্দা। তাঁর সত্তার কিছুমাত্র অংশ নই। সোজা কথায় গডই গডকে বিচার-যাচাই করতে পারে, মানুষ বা অন্য কেউ নয়। মানুষের গড না হওয়াটা যদি মানুষের অপূর্ণতা বা ‘দোষ’ না হয়, তাহলে মানুষ সবকিছু ‘সঠিক’ বুঝতে না পারাটাও তার ত্রুটি বা ‘দোষ’ নয়। মানুষ যতটুকু জানতে পারে, তার জন্য তাই যথেষ্ট। ওহীর মাধ্যমে মানুষকে যা জানানোর, তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এর বাইরে ‘সবকিছু’ জানতে চাওয়া হলো তার নিজেরই ঈশ্বর হয়ে উঠার অবাস্তব, অযৌক্তি ও ব্যর্থ চেষ্টা।

খোদার সাথে মানুষের সম্পর্ক মাস্টার-স্লেভ সম্পর্ক। তা-ই যদি হয়, কোনটা কী হবে তা প্রভু ঠিক করবে, না দাস ঠিক করবে? সঠিক-ভুল ঠিক করার ব্যাপারে মানুষের বুঝতে পারা, সঠিক মনে করা, কনভিন্স হওয়া ইত্যাদি ধরনের দাবিগুলো প্রকারান্তরে মানুষের পক্ষ হতে ঈশ্বরের সমক্যাটাগরি অর্থে সমকক্ষতা দাবি করার শামিল। ঈশ্বরের সংজ্ঞা অনুসারে, মানে গড হাইপোথিসিস অনুসারেই তা যুক্তিবিরোধী হওয়ায় সেটি বাতিল।

৩.

মানুষকে আল্লাহ তায়ালা এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যাতে করে মানুষের সাথে তিনি এক ধরনের ‘মানবিক সম্পর্কে’ এনগেইজ হতে পারেন। তাই তিনি মানুষকে ভালবাসেন। তাদেরকে পথ দেখাতে চান। তাদের জন্য পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। কেউ বলতেই পারেন, আমার এই কথাগুলো অবতারবাদের মতো শোনাচ্ছে। আসলে অবতারের ধারণাকে ইসলাম নবুয়তের ধারণা দিয়ে রিপ্লেস করেছে। সেই অর্থে ইসলাম অবতারবাদকে অস্বীকার করে। কিন্তু স্বয়ং ঈশ্বরের এক ধরনের, বিশেষ করে নৈতিক দিক থেকে, মানবিক রূপায়ণ বা ‘অবয়বের’ কথা ইসলাম বলে। কথাটা এভাবে বলা হয়, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি হিসাবে সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। মুসলমানরা কাবা ঘরকে লক্ষ করে সিজদা করে। সে জন্য কেউ যদি দাবি করে, মুসলমানরাও প্রকারান্তরে মূর্তি-পুজা করে, তার কথাটা যতটা অযৌক্তিক, “মানুষকে আল্লাহ তায়ালা এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যাতে করে মানুষের সাথে তিনি এক ধরনের ‘মানবিক সম্পর্কে’ এনগেইজ হতে পারেন” কথাটির মানে অবতারবাদকে এক রকম স্বীকার করে নেয়া– এমন দাবি করাটাও ততটাই অযৌক্তিক।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই দীর্ঘ উত্তরটা শেষ করছি সেটা হলো– আল্লাহকে মানতে হবে আমাদের আত্মস্বার্থচেতনার দাবি হিসাবে। আমার জ্ঞানগত আত্মকেন্দ্রিকতায় আমিই কেন্দ্র, যদিও আল্লাহর সত্তাগত বাস্তবতার অনন্যতার মোকাবিলায় আমি কিছুই নই। তাই আল্লাহকে জানার চেষ্টা করতে হবে আমাদের দিক থেকে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহকে জানা মানে তাঁর যে অস্তিত্ব আছে সেটি জানা। আল্লাহ কোনো কিছু ঠিক করেছেন নাকি ভুল করেছেন, তিনি আসলেই ন্যায়বান কিনা ইত্যাদি যাচাই করার দাবি যুক্তিসংগত হতে পারে যদি আল্লাহকে আল্লাহর দিক থেকে জানার কোনো সুযোগ থাকে। তো, স্রষ্টার ধারণাগত সংজ্ঞা অনুসারে সৃষ্টি অপূর্ণ। তাই সে পূর্ণ স্রষ্টাকে ধারণ করতে অক্ষম। তাই সৃষ্টির খণ্ডিত দৃষ্টি দিয়ে স্রষ্টার অখণ্ড বাস্তবতাকে জানা অসম্ভব। সে জন্যই স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে জানার চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। স্রষ্টা স্বয়ং কেমন তা আমাদের ধারণাতীত। স্রষ্টা সম্পর্কে এই ধরনের ধারণাই সঠিক। আমাদের জার্নি হলো, world to God. Not, from God to world.

৪.

অতএব, প্রিয় পাঠক, বুঝতেই পারছেন, তিনি শাস্তি দিলেও স্বৈরাচারী নন। তাঁর এবাদত করতে বাধ্য করা হলেও তিনি স্বার্থপর নন। কেন তিনি জগত সৃষ্টি করেছেন, আমাদের সৃষ্টি করেছেন, কেন শুধু স্বর্গ সৃষ্টি না করে নরকও সৃষ্টি করেছেন – এসব আমরা জানি না। আমি শুধু এটুকু বলছি, এসব জানার দাবি করা আমাদেরই যুক্তিবুদ্ধি অনুযায়ী অযৌক্তিক বটে। কেবল সমধর্মীরা পরস্পরকে যাচাই করতে পারে। কেবল সমধর্মীদের (belongs to same category অর্থে) মধ্যেই ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা ক্রিয়াশীল হতে পারে। আমাদের বিবেচনা ও কল্পনাযোগ্য সকল অর্থেই স্রষ্টা অতিবর্তী (transcendent) হওয়ার কারণে এ ধরনের সত্তা আদতে অস্তিত্বসম্পন্ন কিনা, তাই মূল বিবেচ্য। আমাদের অস্তিত্বের কারণ হিসাবে যদি এমন কোনো সত্তার অস্তিত্বকে আমরা মেনে নেই, তাহলে তাঁর হুকুম-আহকাম মানতে না পারার কোনো কারণ দেখি না।

যদি এ ধরনের কোনো সত্তার অস্তিত্ব কেউ না মানতে চান, তাহলে তিনিই বলুন, অন্তত নিজের কাছে নিজে বুঝতে চেষ্টা করুন, তিনি কে? কেন তিনি এখানে? কেন এ জগত? না হলেই বা কী হতো? এ সব প্রশ্নের উত্তরে কেউ নৈরাজ্যবাদ বা নিহিলিজমকে সমর্থন করলে তিনি স্বয়ং একটা স্ববিরোধকে স্বীকার করে নেন। কারণ, তিনি নিরর্থক কিছুই করেন না, যদিও তিনি সামগ্রিকভাবে জগত ও জীবনকে inherently অর্থহীন মনে করেন। এ ধরনের ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পর্যন্ত সুযোগ নাই। কারণ, যারা আত্মহত্যা করে তারা কোনো না কোনো ‘কারণে’ আত্মহত্যা করে। যারা অস্তিত্বের কোনো ‘কারণ’ খুঁজে পান না, তাদের তো দোযখে যাওয়াই যুক্তিসংগত। যাক তারা দোযখে, আসুন, আমরা শাস্তি থেকে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করি। হোক প্রভু ‘স্বার্থপর’! আপনার আমার মধ্যে বেহেশতে যাওয়ার ‘লোভ’ ও ‘স্বার্থপরতা’ থাকার মধ্যে দোষের কিছু আছে বলে মনে করি না।

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য/প্রশ্ন লিখুন

ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।

*